প্রোলোগ
কিছু সত্য চামড়ায় খোদাই হয়ে যায়। ঠিক ক্ষতচিহ্নের মতো নয়... বরং জীবন্ত কালির মতো। সে কালি ছড়ায়, শিরা-উপশিরায় মিশে যায়, অস্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে। রহস্যের ভার আছে। সে ভার পাথরের মতো বুকে চেপে বসে, নিঃশ্বাস নিতে দেয় না। তা থেকে রক্ত ঝরে। সে রক্ত অদৃশ্য, তবু তার দাগ লেগে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। আর আমার... আমার রহস্যগুলো আমাকে অতল জলের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, দমবন্ধ হয়ে আসছে। মনে হয়, এই বুঝি তলিয়ে গেলাম। প্রতিটি নিঃশ্বাসে সেই ভার অনুভব করি, প্রতিটি চিন্তায় সেই কালির লেখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ এক অদ্ভুত যন্ত্রণা, যা কেবল আমিই জানি, আমিই বয়ে বেড়াই। মুক্তি কোথায়? জানি না। আদৌ আছে কি? সেও এক রহস্য। এই রহস্যের জাল ছিঁড়ে বেরোতে চেয়ে যতবার হাত-পা ছুঁড়েছি, ততবার আরও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছি। মনে হয়, এ এক অভিশাপ, যা আমার রক্তে মিশে আছে।
প্রথম অধ্যায়: ছায়াবৃত বর্তমান ও উত্তরাধিকারের বোঝা
কলকাতার এক পুরোনো, ঐতিহ্যবাহী মহাফেজখানার ধুলোমাখা, হলদেটে আলোয় অরিক তার বর্তমানে ডুবে ছিল। বয়স ত্রিশের কোঠায়, চোখে গভীর অনুসন্ধিৎসা আর মুখে এক বিষণ্ণতার ছায়া লেপ্টে থাকত সবসময়। সে ছিল ইতিহাসের ছাত্র, গবেষক। পুরোনো দিনের নথি, চিঠি, ডায়েরির পাতায় সে খুঁজে বেড়াত অতীতের পদচিহ্ন। তবে তার এই অনুসন্ধানের পেছনে শুধু পেশাগত দায়বদ্ধতা ছিল না, ছিল এক ব্যক্তিগত তাড়না, এক অব্যক্ত যন্ত্রণা যা তাকে কুরে কুরে খেত। এই তাড়না সে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, ঠিক যেমন পেয়েছে তার রক্তে বহমান এক অজানা অপরাধবোধ।
অরিকের জন্ম এক বনেদি, কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই সে শুনে এসেছে তাদের পরিবারের গৌরবময় অতীতের কথা, আবার সেই অতীতের সাথেই জড়িয়ে থাকা কিছু চাপা দীর্ঘশ্বাস, কিছু না-বলা কথার গুঞ্জন। তার বাবা, অলোকেশ চৌধুরীর একমাত্র উত্তরসূরী হয়েও, ছিলেন আশ্চর্যজনকভাবে নির্লিপ্ত প্রকৃতির মানুষ। তিনি পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না, কিংবা বলা ভালো, সচেতনভাবেই এড়িয়ে যেতেন। অরিকের ঠাকুমা বেঁচে থাকতে মাঝে মাঝে আবছাভাবে কিছু বলতেন, "তোর দাদুর জীবনে অনেক ঝড় গেছে। কিছু কথা না বলাই ভালো।" এই অসম্পূর্ণ কথাগুলোই অরিকের কৌতূহলকে আরও উস্কে দিত।
অরিকের টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত জীর্ণ পুঁথি, পোকায় কাটা দলিল আর বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ফটোগ্রাফ। সেগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ নীল রঙের চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি তাকে বেশ কিছুদিন ধরে প্রবলভাবে আকর্ষণ করছিল। ডায়েরিটা উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের কোনো এক অখ্যাত জমিদারের লেখা – তার প্রপিতামহ, অলোকেশ চৌধুরী। ভাষা পুরোনো, অনেক পাতা অস্পষ্ট, কিন্তু তার মধ্যেই যেন অরিক নিজের জীবনের কোনো এক অজানা অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিল। বিশেষ করে ডায়েরির কিছু অংশে এমন কিছু ঘটনার বিবরণ ছিল, যা পড়তে গিয়ে অরিকের বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠত। মনে হতো, এই অক্ষরগুলো যেন শুধু কালি নয়, রক্ত দিয়ে লেখা। এই ডায়েরিটা সে পেয়েছিল তাদের পুরোনো বাড়ির চিলেকোঠার এক সিন্দুকে, বহু বছর আগে। তখন সে কিশোর। কিন্তু ডায়েরির ভাষা আর বিষয়বস্তু তার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকেছিল। এখন, পরিণত বয়সে, ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে, সে ডায়েরিটার মর্মোদ্ধার করার চেষ্টা করছিল।
তার সহকর্মীরা তাকে নিয়ে প্রায়শই ঠাট্টা করত। বলত, "অরিক তো ইতিহাসের কবরে বাস করে।" সে মৃদু হাসত, কোনো উত্তর দিত না। তার জগৎটা সত্যিই আলাদা ছিল। সে যেন এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রেখেছিল নিজের চারপাশে। সেই দেওয়ালের ওপারে ছিল তার যন্ত্রণাদগ্ধ আত্মা, যার খবর কেউ রাখত না। তার বন্ধুরা যখন কেরিয়ার, প্রেম, আর পাঁচটা জাগতিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত, অরিক তখন ডুবে থাকত শতাব্দীপ্রাচীন রহস্যের জালে।
একদিন সকালে, যখন অরিক সেই নীল ডায়েরিটা নিয়ে গভীর মনোযোগে ডুবে ছিল, মহাফেজখানার নীরবতা ভেঙে এক নতুন কণ্ঠস্বর শোনা গেল। "এক্সকিউজ মি, আমি কি একটু ভেতরে আসতে পারি?"
অরিক চমকে মুখ তুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে এক তরুণী। পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, আর চোখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। মায়াবী মুখখানিতে কৌতূহল আর আত্মবিশ্বাসের ছাপ। চুলগুলো এলোমেলো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। দেখে মনে হচ্ছে, অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে।
"আমি নীরা। একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। একটা আর্টিকেলের জন্য কিছু পুরোনো নথি ঘাঁটতে এসেছিলাম," তরুণী মিষ্টি হেসে বলল। তার কণ্ঠস্বরে ক্লান্তি থাকলেও, একটা অদ্ভুত প্রাণশক্তি ছিল।
অরিক কয়েক মুহূর্ত নীরার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটির কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, যা তার পরিচিত বিষণ্ণতার জগতে এক ঝলক টাটকা বাতাস নিয়ে এল। সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "হ্যাঁ, ভেতরে আসুন। বলুন কীভাবে সাহায্য করতে পারি?" তার নিজের কণ্ঠস্বরও যেন বহুদিন পর স্বাভাবিক শোনাল।
নীরা তার গবেষণার বিষয়বস্তু সংক্ষেপে জানাল। সে কাজ করছিল কলকাতার পুরোনো দিনের স্থাপত্য এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকা পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে। অরিক তাকে প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র খুঁজে পেতে সাহায্য করল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নীরা টুকটাক কথা বলছিল। তার সহজ সাবলীল আচরণ, তার তীক্ষ্ণ প্রশ্নগুলো অরিককে মুগ্ধ করছিল। অনেকদিন পর সে যেন নিজের তৈরি করা খোলস থেকে একটু বাইরে এসে শ্বাস নিচ্ছিল। নীরা শুধু সুন্দরীই ছিল না, তার বুদ্ধিমত্তাও অরিককে আকর্ষণ করছিল।
নীরা যাওয়ার আগে অরিকের টেবিলের ওপর রাখা নীল ডায়েরিটার দিকে একবার তাকাল। "এটা কি খুব ইন্টারেস্টিং কিছু? মলাটটা দেখেই তো মনে হচ্ছে অনেক পুরোনো।"
অরিক একটু ইতস্তত করে বলল, "হ্যাঁ, মানে... পুরোনো দিনের লেখা। এমনি পড়ছিলাম।" সে কেন যেন ডায়েরিটার ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে চাইল না। এই ডায়েরিটা তার কাছে একটা ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মতো, যা সে কারো সাথে ভাগ করে নিতে চায় না।
নীরা আর কিছু বলল না। ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিল। কিন্তু তার যাওয়ার পরও অরিকের মনে তার ছাপ রয়ে গেল। মেয়েটির চোখের উজ্জ্বলতা, তার কণ্ঠস্বর, তার কৌতূহল – সবকিছুই যেন অরিকের ছায়াবৃত বর্তমানে এক নতুন রঙের আভাস দিয়ে গেল। সে আবার ডায়েরিটার দিকে তাকাল। কালির অক্ষরগুলো যেন আরও জীবন্ত, আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। নীরার উপস্থিতি কি এই রহস্যের সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখবে? নাকি এও এক মরীচিকা? অরিক ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। তবে একটা ক্ষীণ আশা তার মনে উঁকি দিয়ে গেল।
দ্বিতীয় অধ্যায়: কৌতূহলের প্রথম আলো ও সম্পর্কের সূচনা
পরের কয়েকদিন নীরা প্রায় প্রতিদিনই মহাফেজখানায় আসতে লাগল। তার গবেষণার কাজ চলছিল, আর সেই সূত্রেই অরিকের সাথে তার অল্পবিস্তর কথাবার্তা হতো। নীরা মেয়েটি ছিল অত্যন্ত পর্যবেক্ষণশীল এবং সংবেদনশীল। সে খুব তাড়াতাড়ি লক্ষ্য করল অরিকের চরিত্রের অদ্ভুত দিকগুলো। তার মগ্ন হয়ে কাজ করা, তার হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া, তার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতা – কিছুই নীরার নজর এড়াল না। বিশেষ করে সেই নীল চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরিটার প্রতি অরিকের অতিরিক্ত মনোযোগ নীরার কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিল। নীরা বুঝতে পারছিল, এই ডায়েরিটা শুধু একটা পুরোনো দিনের নথি নয়, এর সাথে অরিকের ব্যক্তিগত জীবনের কোনো গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
একদিন দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে নীরা অরিককে কফি খাওয়ার প্রস্তাব দিল। মহাফেজখানার ক্যান্টিনটা প্রায় ফাঁকা। অরিক প্রথমে একটু অবাক হলেও, রাজি হয়ে গেল। ক্যান্টিনের এক কোণে বসে তারা কফি খেতে লাগল। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।
"আপনি সবসময় এত গম্ভীর থাকেন কেন, অরিকদা?" নীরা সরাসরি প্রশ্ন করল, কফির কাপে চুমুক দিয়ে। বৃষ্টির শব্দ তাদের নীরবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল।
অরিক একটু থতমত খেয়ে গেল। "গম্ভীর? কই, না তো! আমি তো এমনই।" সে নিজেকে আড়াল করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল।
নীরা হাসল। তার হাসিতে কোনো বিদ্রূপ ছিল না, ছিল সহমর্মিতা। "আপনার চোখ কিন্তু অন্য কথা বলে। মনে হয়, আপনি যেন কোনো গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন। এমন কিছু, যা আপনাকে ভেতর থেকে কষ্ট দেয়।"
অরিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নীরার সরাসরি অথচ নরম সুরে করা প্রশ্নটা তার ভেতরের দেওয়ালটাকে যেন একটু নাড়িয়ে দিল। সে কফির কাপের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, "কিছু পুরোনো দিনের স্মৃতি... কিছু পারিবারিক ইতিহাস... মাঝে মাঝে খুব ভাবায়।"
"সেই নীল ডায়েরিটা কি সেই রকমই কোনো স্মৃতির সাথে যুক্ত?" নীরার কণ্ঠে সহানুভূতির সুর। সে জানত, সে একটা স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাত করছে, কিন্তু তার মন বলছিল, অরিকের এই নীরব যন্ত্রণা ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে প্রয়োজন।
অরিক নীরার চোখের দিকে তাকাল। মেয়েটির দৃষ্টিতে কোনো বিচার ছিল না, ছিল অকৃত্রিম কৌতূহল আর সহানুভূতি। সে প্রথমবার নিজের ভেতরের দেওয়ালটা একটু আলগা হতে দিল। "ডায়েরিটা আমার এক পূর্বপুরুষের। তবে... এর সাথে এমন কিছু ঘটনা জড়িয়ে আছে, যা আমাদের পরিবারের জন্য খুব সুখকর নয়। একটা অভিশাপের মতো, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলেছে।"
"যদি কিছু মনে না করেন, আমি কি জানতে পারি সেই ঘটনাগুলো?" নীরা সাবধানে জিজ্ঞাসা করল। "আমি সাংবাদিক হলেও, সব কথা খবরে ছাপার জন্য শুনি না। কিছু কথা শুধু শোনার জন্যই শোনা।"
অরিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "আসলে, আমি নিজেও সবটা জানি না। কিছু পারিবারিক মিথ, কিছু অস্পষ্ট ইঙ্গিত... সব মিলিয়ে একটা ধোঁয়াশা। আমি সেই ধোঁয়াশা কাটানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু যত চেষ্টা করছি, ততই যেন আরও গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি।"
নীরা বুঝতে পারল, অরিক এক গভীর রহস্যের জালে জড়িয়ে আছে। তার সাংবাদিক সত্তা জেগে উঠল। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, অরিকের প্রতি তার এক ধরণের মানবিক টান তৈরি হচ্ছিল। ছেলেটার ভেতরের চাপা কষ্টটা সে অনুভব করতে পারছিল। তার মনে হলো, অরিকের মতো একজন বুদ্ধিমান, সংবেদনশীল মানুষ এমন যন্ত্রণার শিকার হওয়া উচিত নয়।
"আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?" নীরা আন্তরিকভাবে বলল। "আমার গবেষণার কাজে অনেক জায়গায় যেতে হয়, অনেক মানুষের সাথে কথা বলতে হয়। হয়তো আপনার কোনো কাজে লাগতে পারি। তাছাড়া, দুটো মাথা একসাথে কাজ করলে অনেক কঠিন সমস্যারও সমাধান করা যায়।"
অরিক নীরার দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল। এই প্রথম কেউ তার এই ব্যক্তিগত লড়াইয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। তার মনে হলো, নীরা হয়তো সেই আলোকবর্তিকা, যা তার অন্ধকার পথে দিশা দেখাতে পারে। তার বাবার নির্লিপ্ততা আর ঠাকুমার অস্পষ্ট কথার বাইরে এই প্রথম কেউ তার এই অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখাল।
"ধন্যবাদ, নীরা। আপনার সাহায্যের প্রস্তাব আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার," অরিকের কণ্ঠে আবেগের ছোঁয়া। "কিন্তু আমি আপনাকে এই জটিলতায় জড়াতে চাই না। এটা আমাদের পারিবারিক অভিশাপ।"
নীরা মৃদু হেসে বলল, "অভিশাপ বলে কিছু হয় না, অরিকদা। যা হয়, তা মানুষেরই তৈরি করা ভুল আর তার পরিণতি। আর আমি জটিলতা ভালোবাসি। সহজ, সাধারণ জীবন আমার জন্য নয়।"
সেইদিন থেকে তাদের সম্পর্কটা একটা নতুন মোড় নিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারা সেই নীল ডায়েরিটা নিয়ে আলোচনা করত। অরিক তার পরিবারের পুরোনো দিনের গল্প, লোকমুখে শোনা কথা, আর ডায়েরির কিছু অংশ নীরাকে জানাল। নীরা মন দিয়ে শুনত, প্রশ্ন করত, নিজের মতামত দিত। অরিকের মনে হতে লাগল, সে আর একা নয়। এই রহস্যের সন্ধানে তার একজন সঙ্গী জুটেছে। নীরার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অদম্য কৌতূহল অরিককে নতুন করে অনুপ্রাণিত করছিল।
নীরা লক্ষ্য করল, অরিক যখন ডায়েরিটার কথা বলত, তখন তার চোখ অন্যরকম হয়ে যেত। যেন সেই কালির অক্ষরগুলো তার কাছে শুধু শব্দ নয়, জীবন্ত চরিত্র। সে অনুভব করতে পারত, এই ডায়েরির প্রতিটি পাতা অরিকের আত্মার সাথে কোনো এক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। নীরা এটাও বুঝতে পারছিল, এই রহস্যের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত অরিক শান্তি পাবে না।
একদিন নীরা অরিকের টেবিলে একটা পুরোনো, বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ফটোগ্রাফ দেখতে পেল। ছবিতে এক যুবক আর এক যুবতী, পুরোনো দিনের পোশাকে। তাদের মুখের আদলের সাথে অরিকের মুখের অদ্ভুত মিল। যুবকের চোখেও সেই একই বিষণ্ণতার ছায়া।
"এরা কারা, অরিকদা?" নীরা কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না।
অরিক ফটোগ্রাফটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার মুখে একটা বেদনার ছাপ ফুটে উঠল। "এরা আমার প্রপিতামহ অলোকেশ চৌধুরী আর প্রপিতামহী মোহিনী দেবী। ডায়েরিটা আমার প্রপিতামহেরই লেখা।"
ফটোগ্রাফটার পেছনে অস্পষ্টভাবে একটা নাম লেখা ছিল – "অলোকেশ ও মোহিনী"। নামের নিচে একটা তারিখ, যা ডায়েরির প্রথম পাতার তারিখের সাথে মিলে যায়।
নীরা চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছিল, এই ফটোগ্রাফ, এই ডায়েরি, আর অরিকের বিষণ্ণ্ণতা – সবকিছুর মধ্যে একটা গভীর যোগসূত্র রয়েছে। কৌতূহলের প্রথম আলো ধীরে ধীরে এক গভীরতর অনুসন্ধানের দিকে তাদের দুজনকে ঠেলে দিচ্ছিল। ভালোবাসার প্রথম মুকুলটিও যেন এই রহস্যের আবছায়া ভেদ করে উঁকি মারতে শুরু করেছিল, যদিও তারা কেউই তখনো সেটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। তাদের অজান্তেই, একে অপরের প্রতি এক ধরণের নির্ভরতা তৈরি হচ্ছিল, যা শুধু বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু।
তৃতীয় অধ্যায়: কালির গভীরে ও শ্যামলগঞ্জের পথে
নীরা পাশে থাকায় অরিকের ভেতরের জড়তা অনেকটাই কেটে গিয়েছিল। সে ঠিক করল, এবার সে সক্রিয়ভাবে তার পারিবারিক রহস্যের কিনারা করবে। মহাফেজখানার চার দেওয়ালের মধ্যে বসে থেকে আর লাভ নেই। নীল ডায়েরিটার পাতায় পাতায় যে ইঙ্গিতগুলো ছড়িয়ে ছিল, সেগুলোকে বাস্তবে মিলিয়ে দেখা দরকার। এতদিন সে একা ছিল, কিন্তু এখন নীরা আছে। নীরার উৎসাহ আর সাহস তাকে নতুন করে শক্তি জুগিয়েছিল।
ডায়েরির এক জায়গায় অলোকেশ তাদের পৈতৃক গ্রাম 'শ্যামলগঞ্জ'-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন। লিখেছিলেন সেখানকার পুরোনো জমিদার বাড়ি, লাগোয়া দিঘি আর এক প্রাচীন মন্দিরের কথা। ডায়েরিতে শ্যামলগঞ্জের বর্ণনা ছিল জীবন্ত, যেন অলোকেশ তার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়ে গ্রামটিকে এঁকেছেন। কিন্তু সেই বর্ণনার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল কিছু অশুভ ইঙ্গিত, কিছু অসমাপ্ত অভিশাপের কথা। অরিক সিদ্ধান্ত নিল, সে শ্যামলগঞ্জে যাবে। এই গ্রামই হয়তো তার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে।
নীরা যখন অরিকের পরিকল্পনার কথা শুনল, সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, "আমিও আপনার সাথে যাব, অরিকদা। দুটো মাথা একসাথে কাজ করলে সুবিধে হবে। তাছাড়া, আমার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাও হয়তো কাজে লাগতে পারে। আর সত্যি বলতে, এই রহস্যটা আমাকেও টানছে।" তার চোখে ছিল অদম্য কৌতূহল আর অরিকের প্রতি গভীর আস্থা।
অরিক প্রথমে একটু ইতস্তত বোধ করল। সে চায়নি তার এই ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে নীরাকে জড়িয়ে ফেলতে। এই পথটা অন্ধকার, কাঁটাভরা। সে নীরাকে কোনো বিপদে ফেলতে চায়নি। কিন্তু নীরার চোখের দৃঢ়তা আর মুখের আন্তরিক অনুরোধ সে উপেক্ষা করতে পারল না। তাছাড়া, মনে মনে সেও চাইছিল নীরা তার সাথে থাকুক। নীরার উপস্থিতি তাকে এক অদ্ভুত মানসিক শক্তি জোগাত। সে নীরার যুক্তির কাছে হার মানল।
সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তারা শ্যামলগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দিল। কলকাতা থেকে বেশ কয়েক ঘণ্টার ট্রেন জার্নি, তারপর বাস, সবশেষে একটা ভাঙাচোরা রিকশায় চেপে তারা যখন শ্যামলগঞ্জে পৌঁছাল, তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় গ্রামটাকে কেমন যেন রহস্যময় লাগছিল।
গ্রামটা যেন সময় থমকে যাওয়া কোনো ক্যানভাস। পুরোনো দিনের মাটির বাড়ি, পুকুর, আমবাগান – সবকিছু মিলিয়ে এক শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশের আড়ালেই যেন লুকিয়ে ছিল বহু বছরের পুরোনো কোনো রহস্য, কোনো চাপা দীর্ঘশ্বাস। গ্রামের বাতাসে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতার সুর।
তারা গ্রামের প্রান্তে পুরোনো জমিদার বাড়িটার খোঁজ পেল। বিশাল বাড়ি, কিন্তু এখন প্রায় ভগ্নদশা। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, দরজা-জানালা ভাঙা। চারদিকে আগাছার জঙ্গল। দেখলেই বোঝা যায়, বহু বছর এখানে কেউ বাস করে না। বাড়িটার দিকে তাকালেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। মনে হয়, এই দেওয়ালগুলো অনেক না-বলা কথার সাক্ষী।
বাড়ির কাছাকাছি যেতেই একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন। পরনে ময়লা ধুতি, খালি গা, কাঁধে একটা গামছা। চোখে মোটা কাঁচের চশমা। মুখের চামড়ায় বয়সের অসংখ্য রেখা, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। "কার খোঁজ করছেন, বাবা-মা?" বৃদ্ধের কণ্ঠে কৌতূহল, কিছুটা সন্দেহও।
অরিক বলল, "আমরা এই পুরোনো জমিদার বাড়িটা দেখতে এসেছি। শুনলাম, এটা নাকি অলোকেশ চৌধুরীর বাড়ি ছিল?"
বৃদ্ধের চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল। "হ্যাঁ, বাবু। এটা চৌধুরী বাবুদেরই বাড়ি। আমি এই বাড়ির পুরোনো চাকর বংশের লোক। আমার নাম হরিপদ। আমার দাদাও এই বাড়িতে কাজ করতেন।" তার কণ্ঠস্বরে গর্ব আর বিষণ্ণতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
অরিক আর নীরা একে অপরের দিকে তাকাল। ভাগ্য তাদের সহায়। হরিপদর মতো একজন প্রত্যক্ষদর্শী তাদের অনেক সাহায্য করতে পারবে।
হরিপদ তাদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। ভাঙাচোরা ঘর, ধুলো আর মাকড়সার জালে ভর্তি। দেওয়ালে টাঙানো কয়েকটা পুরোনো অয়েল পেন্টিং কোনোমতে টিকে আছে, তাদের রঙ চটে গেছে, মুখগুলো অস্পষ্ট। হরিপদ তাদের বিভিন্ন ঘর ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল আর পুরোনো দিনের গল্প বলতে লাগল। অলোকেশ চৌধুরী, তার স্ত্রী মোহিনী দেবী, তাদের জীবনযাত্রা – সবকিছুই যেন হরিপদর মুখে জীবন্ত হয়ে উঠছিল। হরিপদর বর্ণনায় অলোকেশ ছিলেন একাধারে দয়ালু এবং মেজাজী। আর মোহিনী দেবী ছিলেন রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। গ্রামের সবাই তাকে দেবীর মতো শ্রদ্ধা করত।
নীরা খুব মন দিয়ে হরিপদর কথা শুনছিল আর মাঝে মাঝে নোট নিচ্ছিল। তার সাংবাদিক মন তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত, কিন্তু তার নারীমন মোহিনী দেবীর জন্য এক ধরণের সহানুভূতি অনুভব করছিল। অরিক ডায়েরির কিছু অংশের সাথে হরিপদর কথার মিল খুঁজে পাচ্ছিল। কালির অক্ষরগুলো যেন সত্যিই কথা বলতে শুরু করেছে।
হরিপদ তাদের বাড়ির পেছনের দিঘিটার কাছে নিয়ে গেল। দিঘির জল টলটলে সবুজ, কিন্তু কেমন যেন নিথর, প্রাণহীন। পাড়ে একটা পুরোনো শ্যাওলা ধরা ঘাট। দিঘির চারপাশে বড় বড় গাছ, তাদের ছায়া দিঘির জলকে আরও অন্ধকার করে তুলেছে।
"এই দিঘি নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়, বাবু," হরিপদ নিচু গলায় বলল, যেন কোনো গোপন কথা বলছে। "লোকে বলে, এই দিঘিতে নাকি চৌধুরীদের বাড়ির এক বউ আত্মহত্যা করেছিল। তারপর থেকে এই দিঘির জল কেউ ব্যবহার করে না। রাতে এর পাশ দিয়ে যেতেও ভয় পায় লোকে।"
অরিকের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। ডায়েরিতে অলোকেশও একটা রহস্যময় মৃত্যুর কথা লিখেছিলেন, কিন্তু বিস্তারিত কিছু জানাননি। শুধু লিখেছিলেন, "এক অতল জলের oscuridad গ্রাস করেছে সব আলো।" এই লাইনটা অরিককে বহুদিন ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
তারা দিঘির পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো মন্দিরটার কাছে এসে পৌঁছাল। ছোট মন্দির, কিন্তু তার স্থাপত্যে প্রাচীনত্বের ছাপ স্পষ্ট। মন্দিরের দেওয়াল শ্যাওলায় ঢাকা, চূড়াটা ভেঙে পড়েছে। মন্দিরের ভেতরে কোনো বিগ্রহ নেই, শুধু একটা ভাঙা বেদি পড়ে আছে। চারদিকে কেমন যেন একটা পরিত্যক্ত, অপার্থিব পরিবেশ।
"এই মন্দিরটা নাকি মোহিনী দেবীর খুব প্রিয় ছিল," হরিপদ বলল। "তিনি প্রতিদিন এখানে পুজো দিতে আসতেন। এই মন্দিরেই তিনি শান্তি খুঁজে পেতেন।"
অরিক মন্দিরের চারপাশ ভালো করে দেখতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটার সাথে ডায়েরির কোনো একটা যোগসূত্র রয়েছে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল মন্দিরের পেছনের দেওয়ালে। সেখানে শ্যাওলার আড়ালে আবছাভাবে কিছু খোদাই করা অক্ষর দেখা যাচ্ছে।
নীরা আর অরিক দুজনেই ঝুঁকে পড়ে অক্ষরগুলো উদ্ধার করার চেষ্টা করল। শ্যাওলা সরাতেই স্পষ্ট হলো কয়েকটা নাম আর একটা তারিখ। নামগুলো ছিল "অলোকেশ", "মোহিনী" আর একটা অজানা নাম – "মাধব"। তারিখটা ছিল অলোকেশের ডায়েরিতে উল্লিখিত সেই রহস্যময় ঘটনার কয়েকদিন পরের।
অরিক আর নীরা দুজনেই বুঝতে পারল, তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের কাছাকাছি এসে পড়েছে। এই "মাধব" কে? তার সাথে অলোকেশ আর মোহিনীর কী সম্পর্ক? হরিপদও এই নামের কাউকে চেনে বলে মনে হলো না। আর সেই তারিখটাই বা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
শ্যামলগঞ্জের বাতাসে ভাসতে থাকা পুরোনো দিনের গন্ধ, হরিপদর মুখে শোনা গল্প, দিঘির নিথর জল আর মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা নাম – সবকিছু মিলিয়ে রহস্যটা যেন আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল। অরিক অনুভব করল, সে কালির আরও গভীরে প্রবেশ করছে, যেখানে প্রতিটি অক্ষর এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, আবার কখনও কখনও আরও জটিল ধাঁধার সৃষ্টি করছে। নীরা তার পাশে ছিল, তার হাতে হাত রেখে। তাদের দুজনের সম্মিলিত কৌতূহল আর একে অপরের প্রতি বিশ্বাসই ছিল এই অন্ধকার পথে তাদের একমাত্র আলো। এই প্রথম অরিকের মনে হলো, সে হয়তো এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতেও পারে।
চতুর্থ অধ্যায়: রক্তিম সংকেত ও মাধবের ছায়া
শ্যামলগঞ্জ থেকে ফিরে আসার পর অরিক আর নীরা আরও নিবিষ্টভাবে রহস্যের সমাধানে লেগে পড়ল। মন্দিরের দেওয়ালে পাওয়া "মাধব" নামটি তাদের অনুসন্ধানের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল। কে এই মাধব? অলোকেশের ডায়েরিতে তার কোনো উল্লেখ নেই। হরিপদও এই নামের কাউকে চিনত না, বা চিনলেও বলতে চায়নি। এই নীরবতাটাই যেন মাধবের চরিত্রকে আরও রহস্যময় করে তুলছিল।
নীরা তার সাংবাদিকতার নেটওয়ার্ক কাজে লাগাল। পুরোনো দিনের খবরের কাগজ, বিভিন্ন লাইব্রেরির আর্কাইভ, এমনকি সরকারি নথিপত্র ঘাঁটতে শুরু করল সে। সে জানত, কোথাও না কোথাও এই মাধবের একটা সূত্র লুকিয়ে আছে। অরিকও মহাফেজখানায় তার পরিচিত সূত্রগুলো কাজে লাগাতে লাগল। সে পুরোনো জমিদারি সেরেস্তার কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল।
কয়েক সপ্তাহ পর, নীরা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে পেল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকের একটা স্থানীয় সংবাদপত্রের ছেঁড়া পাতায় শ্যামলগঞ্জের জমিদারবাড়ি সম্পর্কিত একটা ছোট খবর ছাপা হয়েছিল। খবরটা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত এবং অস্পষ্ট। তাতে উল্লেখ ছিল, জমিদার অলোকেশ চৌধুরীর স্ত্রী মোহিনী দেবীর অকালমৃত্যুর পর তাদের পরিবারে এক গভীর শোক নেমে আসে। তবে খবরের এক কোণে খুব অস্পষ্টভাবে লেখা ছিল যে, মোহিনী দেবীর মৃত্যুর কিছুদিন আগে জমিদারবাড়ির এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়, মাধব নামের এক যুবক, রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। পুলিশ তদন্ত করেও তার কোনো কিনারা করতে পারেনি। খবরটা এমনভাবে ছাপা হয়েছিল, যেন কেউ ইচ্ছে করেই মাধবের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটাকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল।
এই তথ্যটা পাওয়ার পর অরিক আর নীরা দুজনেই উত্তেজিত হয়ে উঠল। মোহিনী দেবীর মৃত্যু আর মাধবের নিখোঁজ হওয়া – এই দুটো ঘটনার মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র রয়েছে? মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা নামগুলো কি সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে? অলোকেশ, মোহিনী, মাধব – এই তিনটে নাম যেন একটা ত্রিভুজ তৈরি করছিল, যার কেন্দ্রে ছিল এক অজানা, ভয়ঙ্কর রহস্য।
অরিক আবার নীল ডায়েরিটা খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করল। এবার সে বিশেষ মনোযোগ দিল মোহিনী দেবীর মৃত্যুর সমসাময়িক লেখাগুলোর ওপর। অলোকেশ তার স্ত্রীর মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত ছিলেন, সেটা তার লেখায় স্পষ্ট। তিনি লিখেছিলেন, "আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল। মোহিনী বিহনে এ জীবন মরুভূমি।" কিন্তু সেই শোকের আড়ালে যেন একটা চাপা অপরাধবোধও লুকিয়ে ছিল। কিছু কিছু বাক্য ছিল অসংলগ্ন, কিছু শব্দ যেন ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন, "আমি যা করেছি, তা কি ঠিক ছিল? ইতিহাস কি আমাকে ক্ষমা করবে?" এই "যা করেছি" কথাটার মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল আসল রহস্য।
"আমার মনে হচ্ছে, অলোকেশ চৌধুরী কিছু একটা লুকাতে চাইছিলেন," নীরা বলল, অরিকের পাশে বসে ডায়েরির পাতাগুলো দেখতে দেখতে। "তার ডায়েরিটা শুধু শোকের বিবরণ নয়, এটা হয়তো একটা স্বীকারোক্তিও। একটা অসম্পূর্ণ স্বীকারোক্তি।"
অরিক নীরার সাথে একমত হলো। "কিন্তু কী লুকাতে চাইছিলেন তিনি? আর মাধবের নিখোঁজ হওয়ার সাথে এর কী সম্পর্ক? মাধব কি তাদের দুজনের মধ্যে কোনোভাবে এসে পড়েছিল?"
তারা ঠিক করল, আবার শ্যামলগঞ্জে যাবে। এবার তাদের উদ্দেশ্য হরিপদর সাথে আরও বিস্তারিত কথা বলা এবং গ্রামের প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকে মাধব সম্পর্কে কিছু জানা। হরিপদ প্রথমবার হয়তো সব কথা খুলে বলেনি। তার চোখে একটা ভয় বা সংকোচ তারা লক্ষ্য করেছিল।
দ্বিতীয়বার শ্যামলগঞ্জে গিয়ে তারা প্রথমেই হরিপদর সাথে দেখা করল। এবার তারা মাধবের নামটা সরাসরি উল্লেখ করল এবং সংবাদপত্রের সেই কাটিংটাও দেখাল। মাধবের কথা জিজ্ঞাসা করতেই হরিপদর মুখের ভাব পাল্টে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "মাধব বাবু ছিলেন চৌধুরী বাড়ির দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নে। খুব অল্প বয়সে বাবা-মা মারা যাওয়ায় অলোকেশ বাবুই তাকে নিজেদের কাছে এনে রেখেছিলেন। ছেলেটা খুব ভালো ছবি আঁকত। আর... আর মোহিনী মায়েরও খুব ন্যাওটা ছিল।" তার কণ্ঠস্বরটা এবার যেন আরও ভারি শোনাল।
"ন্যাওটা ছিল মানে?" নীরা প্রশ্ন করল, হরিপদর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে।
হরিপদ একটু ইতস্তত করে বলল, "মানে, মোহিনী মা তাকে খুব স্নেহ করতেন। মাধব বাবুও মোহিনী মাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তবে গ্রামের কেউ কেউ তাদের এই সম্পর্ক নিয়ে আড়ালে আবডালে কানাঘুষো করত। বলত, তাদের মধ্যে নাকি অন্যরকম সম্পর্ক ছিল।" হরিপদর গলার স্বর নিচু হয়ে এল।
অরিক আর নীরার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। তাহলে কি মাধব আর মোহিনীর মধ্যে কোনো নিষিদ্ধ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল? আর সেটাই কি মোহিনীর অকালমৃত্যু এবং মাধবের নিখোঁজ হওয়ার কারণ? অরিকের নিজের পূর্বপুরুষের প্রতি একটা তীব্র ঘৃণা জন্ম নিল।
তারা গ্রামের আরও কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সাথে কথা বলল। তাদের কাছ থেকেও একই ধরণের ইঙ্গিত পাওয়া গেল। মাধব ছিল সুদর্শন, প্রতিভাবান শিল্পী। গ্রামের অনেকেই তার আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হতো। আর মোহিনী দেবী ছিলেন অসামান্য রূপসী ও বিদুষী। তিনি কবিতা লিখতেন, গান গাইতেন। তাদের মধ্যে একটা গভীর মানসিক বন্ধন তৈরি হয়েছিল, যা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ ভালো চোখে দেখেনি। গ্রামের মোড়ল গোছের লোকেরা অলোকেশ চৌধুরীর কানভারী করতে শুরু করেছিল।
এইসব তথ্য অরিককে আরও বিচলিত করে তুলল। তার পূর্বপুরুষ অলোকেশ কি এই সম্পর্কের কথা জানতে পেরেছিলেন? তিনি কি ক্ষিপ্ত হয়ে মাধবকে সরিয়ে দিয়েছিলেন? আর মোহিনী দেবী? তিনি কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকেও... এই চিন্তাগুলো অরিককে কুরে কুরে খেতে লাগল। তার মনে হতে লাগল, সে যে রহস্যের সন্ধান করছে, তার শেষটা হয়তো খুব ভয়ঙ্কর। "রহস্যের রক্ত ঝরে" – প্রোলোগের সেই লাইনটা তার কানে বাজতে লাগল। এই রক্তিম সংকেতগুলো তাকে এক অন্ধকার সত্যের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। তার নিজের রক্তেও যেন সেই কলঙ্কের দাগ সে অনুভব করতে পারছিল।
নীরা অরিকের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছিল। সে অরিকের হাত ধরে বলল, "অরিকদা, আমরা যা ভাবছি, তা সত্যি নাও হতে পারে। আমরা এখনো পুরোটা জানি না। সাহস হারাবেন না। আমরা শেষ পর্যন্ত দেখব।" নীরার স্পর্শে অরিক কিছুটা ভরসা পেল।
কিন্তু অরিকের মন শান্ত হচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল, এই রহস্যের কালি শুধু তার পূর্বপুরুষদের নয়, তাকেও কলঙ্কিত করছে। তার নিজের অস্তিত্বের ওপর একটা কালো ছায়া নেমে আসছিল। এই ছায়া ভেদ করে সে কি আদৌ আলোর দেখা পাবে?
শ্যামলগঞ্জ থেকে ফেরার পথে অরিক প্রায় কথাই বলল না। তার বুকের ভেতর একটা ঝড় চলছিল। নীরাও তাকে বিরক্ত করল না। সে জানত, অরিককে নিজের সাথে বোঝাপড়া করার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া দরকার। তবে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এই রহস্যের শেষ না দেখে সে থামবে না। শুধু অরিকের জন্য নয়, মোহিনী আর মাধবের জন্যও।
কলকাতায় ফিরে অরিক নিজেকে প্রায় ঘরবন্দি করে ফেলল। সে নীল ডায়েরিটা বারবার পড়ত, দেওয়ালে টাঙানো অলোকেশ আর মোহিনীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকত। ছবিটার দিকে তাকালে তার মনে হতো, মোহিনীর চোখ দুটো যেন তার কাছে কিছু বলতে চাইছে, কোনো অজানা আর্তি জানাচ্ছে। তার ঘুম কমে গিয়েছিল, খাওয়া-দাওয়ায় অনীহা দেখা দিয়েছিল।
নীরা প্রায় প্রতিদিনই অরিকের খোঁজ নিত। সে অরিককে বোঝানোর চেষ্টা করত যে, অতীতের ভুলের জন্য বর্তমানকে কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু অরিকের মনের ক্ষত এতটাই গভীর ছিল যে, কোনো সান্ত্বনাতেই কাজ হচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল, সে নিজেই যেন সেই অভিশাপের অংশ।
একদিন নীরা অরিকের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখল, ঘরের জিনিসপত্র সব লন্ডভন্ড। অরিক টেবিলের ওপর মাথা রেখে বসে আছে, তার কাঁধ দুটো কাঁপছে। নীল ডায়েরিটা মেঝেতে পড়ে আছে, কয়েকটা পাতা ছেঁড়া। ঘরের বাতাসে একটা চাপা কান্না আর হতাশার গন্ধ।
নীরা ছুটে গিয়ে অরিককে জড়িয়ে ধরল। "কী হয়েছে, অরিকদা? আপনি এমন করছেন কেন? প্লিজ, নিজেকে এভাবে কষ্ট দেবেন না।"
অরিক ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। "আমি আর পারছি না, নীরা। এই সত্যিটা আমি মেনে নিতে পারছি না। আমার পূর্বপুরুষ একজন খুনি... আর আমি তার রক্ত বহন করছি। এই কলঙ্ক থেকে আমার মুক্তি নেই।" তার কণ্ঠস্বরে ছিল গভীর হতাশা আর আত্মগ্লানি।
নীরা অরিককে শান্ত করার চেষ্টা করল। সে বুঝতে পারছিল, অরিক এক চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যে সত্যের সন্ধানে তারা এতদিন ছুটে বেড়িয়েছে, সেই সত্য আজ তাদের সামনে এক ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। এই রক্তিম সংকেতগুলো তাদের ভালোবাসার পরীক্ষাও নিচ্ছিল। নীরা কি পারবে অরিককে এই অতল হতাশা থেকে টেনে তুলতে? তাদের সম্পর্ক কি এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে টিকে থাকতে পারবে? উত্তরটা তখনো অজানা। তবে নীরা মনে মনে জানত, সে অরিককে ছেড়ে যাবে না, যতই কঠিন পরিস্থিতি আসুক না কেন।
পঞ্চম অধ্যায়: সত্যের মুখোমুখি ও মোহিনীর চিঠি
অরিকের মানসিক অবস্থা দেখে নীরা গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারছিল, শুধু অনুমান আর পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তাদের আরও কিছু প্রমাণ দরকার, যা অলোকেশ চৌধুরীর আসল ভূমিকাটা স্পষ্ট করে দেবে। অরিককে এই আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি দিতে হলে, সত্যের পূর্ণাঙ্গ রূপটা সামনে আনা দরকার, তা যতই ভয়ঙ্কর হোক না কেন।
নীরা আবার মহাফেজখানার পুরোনো ফাইলপত্র ঘাঁটতে শুরু করল। এবার তার লক্ষ্য ছিল অলোকেশ চৌধুরীর সমসাময়িক কালের পুলিশি এবং আদালতের নথি। যদি মাধবের নিখোঁজ হওয়া বা মোহিনী দেবীর মৃত্যু নিয়ে কোনো রকম অস্বাভাবিকতা থেকে থাকে, তাহলে তার উল্লেখ নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও পাওয়া যাবে। সে জানত, কাজটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো, কিন্তু সে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়।
কয়েকদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, লাইব্রেরির ধুলোমাখা, প্রায় পরিত্যক্ত একটা অংশে, নীরা একটা পুরোনো, উইপোকায় কাটা ফাইলের সন্ধান পেল। ফাইলটা ছিল শ্যামলগঞ্জ থানার সেই সময়কার কেস ডায়েরি। ফাইলটার অবস্থা খুবই জীর্ণ, পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, অনেক জায়গায় কালি অস্পষ্ট। কাঁপা কাঁপা হাতে নীরা ফাইলটা খুলল। তার বুকের ভেতরটা টিপটিপ করছিল।
ফাইলের ভেতরে মাধবের নিখোঁজ হওয়ার কেসটার বিবরণ ছিল। পুলিশি তদন্তে বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। কেসটা একটা অমীমাংসিত রহস্য হিসেবেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফাইলের একেবারে শেষে, একটা আলাদা, সিল করা খামে, কয়েকটা চিঠি পাওয়া গেল। চিঠিগুলো হাতে লেখা, কালি প্রায় অস্পষ্ট, কাগজগুলোও জীর্ণ। সেগুলো ছিল মোহিনী দেবীর লেখা, তার মৃত্যুর কিছুদিন আগেকার। চিঠিগুলো তিনি তার এক বাল্যবন্ধুকে লিখেছিলেন, যিনি তখন অন্য শহরে থাকতেন। সম্ভবত, মোহিনীর মৃত্যুর পর তার বান্ধবীর কাছ থেকে পুলিশ এই চিঠিগুলো সংগ্রহ করেছিল, কিন্তু কোনো কারণে সেগুলো মূল রিপোর্টের সাথে যুক্ত করা হয়নি, অথবা কেউ সরিয়ে ফেলেছিল।
নীরা রুদ্ধশ্বাসে চিঠিগুলো পড়তে শুরু করল। প্রথম কয়েকটা চিঠিতে মোহিনী তার একাকিত্ব, শ্যামলগঞ্জের রক্ষণশীল পরিবেশ আর তার প্রতি অলোকেশের উদাসীনতার কথা লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, "এই বিশাল জমিদার বাড়িতে আমি যেন এক বন্দিনী। আমার মনের কথা শোনার কেউ নেই। অলোকেশ সারাদিন জমিদারি নিয়ে ব্যস্ত, আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।"
কিন্তু শেষের চিঠিটা ছিল অন্যরকম। সেই চিঠিতে মোহিনী এক ভয়ঙ্কর সত্য প্রকাশ করেছিলেন। তার লেখার প্রতিটি অক্ষরে ছিল চাপা আতঙ্ক আর হতাশা।
মোহিনী লিখেছিলেন যে, মাধব তার জীবনে এক নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছিল। মাধবের শিল্প প্রতিভা, তার সংবেদনশীল মন মোহিনীকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। তাদের মধ্যে একটা পবিত্র,প্লেটোনিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মাধব মোহিনীর কবিতা ভালোবাসত, আর মোহিনী ভালোবাসতেন মাধবের আঁকা ছবি। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাহিত্য, শিল্প নিয়ে আলোচনা করতেন। এই নির্দোষ সম্পর্কটাই অলোকেশের চোখে সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি মাধবকে নানাভাবে অপমান করতেন, ভয় দেখাতেন। মোহিনীকেও তিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন।
চিঠির শেষ অংশে মোহিনী যা লিখেছিলেন, তা পড়তে গিয়ে নীরার হাত কাঁপতে লাগল। মোহিনী লিখেছিলেন, "আমার ভয় হচ্ছে, মাধবের কোনো বিপদ হতে পারে। অলোকেশের চোখের দৃষ্টি ভালো নয়। সে আমাকেও সন্দেহ করে। তার সেই দৃষ্টি দেখলে আমার সারা শরীর ভয়ে কেঁপে ওঠে। যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে জানবে, এর জন্য অলোকেশই দায়ী। আমি মাধবকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। সে কোথায় আছে, আমি জানি না। কাল রাতে অলোকেশ তাকে ডেকে পাঠিয়েছিল, তারপর থেকে মাধব নিখোঁজ। আমার মনে হচ্ছে, অলোকেশ তাকে..."
চিঠির বাকি অংশটা ছেঁড়া ছিল। যেন কেউ ইচ্ছে করেই ছিঁড়ে ফেলেছে, অথবা লেখার সময়ই মোহিনী আর লিখতে পারেননি।
নীরা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তাহলে তাদের অনুমানই সত্যি! অলোকেশ চৌধুরী শুধু সন্দেহবাতিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভয়ঙ্কর হিংস্র। মাধবের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তারই হাত ছিল। আর মোহিনী? তিনি কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকেও... এই ছেঁড়া অংশটাই যেন সেই ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে।
নীরা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে চিঠিগুলো নিয়ে অরিকের ফ্ল্যাটের দিকে ছুটল। তার বুকের ভেতর তখন আনন্দ আর ভয়ের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আনন্দ, কারণ সে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে। আর ভয়, কারণ এই সত্য অরিককে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা সে জানে না।
অরিক তখনো বিষণ্ণতার অন্ধকারে ডুবে ছিল। ঘরের দরজাটা সামান্য খোলা। নীরাকে দেখে সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তার চোখ দুটো লাল, চুল উশকোখুশকো। নীরা তার হাত ধরে টেনে তুলল। "অরিকদা, আমি কিছু প্রমাণ পেয়েছি। আপনাকে এটা দেখতে হবে। মোহিনী দেবীর নিজের হাতে লেখা চিঠি।"
অরিক নীরার মুখের দিকে তাকাল। নীরার চোখে উত্তেজনার ছাপ, কিন্তু তার মুখ ফ্যাকাসে। সে নীরার হাত থেকে চিঠিগুলো নিল। কাঁপা কাঁপা হাতে সে চিঠিগুলো পড়ল। পড়তে পড়তে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। শরীরটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
"তাহলে... তাহলে সব সত্যি?" অরিকের কণ্ঠস্বর ভেঙে আসছিল। "আমার প্রপিতামহ... তিনি... তিনি একজন..." সে কথাটা উচ্চারণ করতে পারল না।
নীরা অরিকের হাত শক্ত করে ধরল। "অরিকদা, আমি জানি এটা আপনার জন্য কতটা কঠিন। কিন্তু সত্যকে আমাদের মেনে নিতেই হবে। মোহিনী দেবী নিরপরাধ ছিলেন। মাধবও।"
অরিক কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা, সমস্ত অপরাধবোধ যেন বাঁধভাঙা বন্যার মতো বেরিয়ে আসতে চাইল। সে নীরাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। "আমি কী করব, নীরা? এই কলঙ্কের বোঝা আমি কীভাবে বইব? আমার রক্তে একজন খুনির রক্ত।"
নীরা অরিকের মাথায় হাত বোলাতে লাগল। "আপনি একা নন, অরিকদা। আমি আপনার পাশে আছি। আমরা একসাথে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করব। আপনার প্রপিতামহের ভুলের জন্য আপনি দায়ী নন। আপনি একজন সৎ, সংবেদনশীল মানুষ। এটাই আপনার আসল পরিচয়।"
সেই মুহূর্তে, অরিকের মনে হলো, নীরা যেন তার জীবনের ধ্রুবতারা। এই ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নীরা তাকে ছেড়ে যায়নি। বরং আরও শক্ত করে তার হাত ধরেছে। এই ভালোবাসা, এই নির্ভরতা – এটাই হয়তো তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তার মনে হলো, মোহিনী দেবী যেন নীরার মাধ্যমেই তার কাছে সুবিচার চাইছেন।
কিন্তু সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পালা তখনো শেষ হয়নি। মোহিনী দেবীর চিঠিতে একটা অসম্পূর্ণ বাক্য ছিল – "আমার মনে হচ্ছে, অলোকেশ তাকে..." তাকে কী? খুন করেছে? নাকি অন্য কোথাও সরিয়ে দিয়েছে? আর মোহিনী দেবীর নিজের পরিণতি কী হয়েছিল? তিনি কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি...?
তারা ঠিক করল, শ্যামলগঞ্জে গিয়ে হরিপদকে চিঠিগুলো দেখাবে। হয়তো হরিপদ এই বিষয়ে আরও কিছু আলোকপাত করতে পারবে। হরিপদর বয়স হয়েছে, কিন্তু তার স্মৃতিশক্তি এখনো প্রখর। সে-ই হয়তো এই ছেঁড়া চিঠির অসম্পূর্ণ অংশটা পূরণ করতে পারবে।
শ্যামলগঞ্জে গিয়ে তারা হরিপদকে মোহিনী দেবীর চিঠিগুলো দেখাল। চিঠিগুলো দেখে হরিপদর চোখ জলে ভরে উঠল। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "মোহিনী মা ঠিকই লিখেছিলেন। চৌধুরী বাবু খুব রাগী আর একগুঁয়ে স্বভাবের ছিলেন। মাধব বাবুকে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। ওই চিঠি লেখার কয়েকদিন পরেই সব শেষ হয়ে যায়।"
"তাহলে মাধব বাবুর কী হয়েছিল?" অরিক রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞাসা করল।
হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "সেই রাতে খুব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি তখন ছোট ছিলাম, কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে, চৌধুরী বাবু আর মাধব বাবুর মধ্যে খুব ঝগড়া হয়েছিল। চৌধুরী বাবুর চিৎকারে সারা বাড়ি কাঁপছিল। তারপর মাধব বাবুকে আর কেউ দেখেনি। গ্রামের লোকেরা বলত, চৌধুরী বাবুই নাকি তাকে দিঘির জলে ডুবিয়ে মেরেছেন। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছিল না। পুলিশও কিছু করতে পারেনি। চৌধুরী বাবু খুব প্রভাবশালী ছিলেন।"
"আর মোহিনী দেবী?" নীরা প্রশ্ন করল, তার কণ্ঠস্বরও ধরে আসছিল।
"মাধব বাবু নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর মোহিনী মাকেও আর পাওয়া যায়নি। সবাই বলত, তিনি নাকি দুঃখে দিঘিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তার মৃতদেহও নাকি দিঘিতে পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না। আমার মনে হয়, চৌধুরী বাবুই... মোহিনী মা আত্মহত্যা করার মতো মানুষ ছিলেন না। তিনি খুব সাহসী ছিলেন।" হরিপদ আর বলতে পারল না। তার গলা ধরে এল। সে আঁচল দিয়ে চোখ মুছল।
অরিক আর নীরা স্তব্ধ হয়ে গেল। তাহলে এটাই সেই ভয়ঙ্কর সত্য! অলোকেশ চৌধুরী শুধু মাধব নয়, মোহিনী দেবীকেও হত্যা করেছিলেন। তার ডায়েরিতে লেখা শোকের কথাগুলো ছিল নিছক অভিনয়, নিজের অপরাধ ঢাকার একটা মরিয়া চেষ্টা। অথবা, হয়তো সেই শোকের মধ্যে কিছুটা হলেও অনুতাপ ছিল, যা তিনি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেননি।
অরিকের মনে হলো, তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। সে যে মানুষটাকে এতদিন ধরে তার পূর্বপুরুষ হিসেবে জেনে এসেছে, সে আসলে এক ঠান্ডা মাথার খুনি। এই সত্য মেনে নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। তার "ডুবে যাওয়ার" অনুভূতিটা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে যেন সেই শ্যামলগঞ্জের অভিশপ্ত দিঘির অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।
নীরা অরিকের কাঁধে হাত রাখল। তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা। "অরিকদা, সত্য যতই কঠিন হোক, তা আমাদের গ্রহণ করতে হবে। আপনার প্রপিতামহের ভুলের জন্য আপনি দায়ী নন। আপনি একজন সৎ, সংবেদনশীল মানুষ। এটাই আপনার আসল পরিচয়। মোহিনী দেবী আর মাধবের আত্মা আজ হয়তো শান্তি পাবে।"
নীলার কথাগুলো অরিকের হৃদয়ে গিয়ে লাগল। সে নীরার মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটির চোখে সে দেখতে পেল অসীম ভালোবাসা আর বিশ্বাস। এই ভালোবাসাই হয়তো তাকে এই ভয়ঙ্কর সত্যের আঘাত সহ্য করার শক্তি জোগাবে।
সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অরিক অনুভব করল, তার ভেতরের "জীবন্ত কালি" যেন আরও গাঢ়, আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই কালি কলঙ্কের, এই কালি বেদনার। কিন্তু এই কালির পাশেই ফুটে উঠেছে ভালোবাসার এক নতুন অক্ষর, যা তাকে বাঁচার প্রেরণা দিচ্ছে। সে ঠিক করল, এই সত্য সে दुनिया (বিশ্বের) সামনে তুলে ধরবে। মোহিনী আর মাধবের প্রতি যে অবিচার হয়েছে, তার প্রতিকার তাকেই করতে হবে।
ষষ্ঠ অধ্যায়: নতুন ভোর নাকি অন্তহীন রাত? প্রায়শ্চিত্ত ও মুক্তি
শ্যামলগঞ্জ থেকে ফিরে আসার পর অরিক আর নীরা এক গভীর নীরবতার মধ্যে ডুবে গেল। ভয়ঙ্কর সত্যটা তাদের দুজনের জীবনকেই ওলটপালট করে দিয়েছিল। অরিকের মনে হচ্ছিল, সে যেন এক অন্তহীন রাতের যাত্রী, যেখানে ভোরের আলো পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই। তার পূর্বপুরুষের অপরাধের ছায়া তাকে গ্রাস করে ফেলছিল। সে আয়নায় নিজের মুখ দেখতেও ভয় পাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল অলোকেশ চৌধুরীর ছায়া তার উপর ভর করেছে।
নীরা অরিকের পাশে ছিল ছায়ার মতো। সে জানত, এই মুহূর্তে অরিকের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক আশ্রয়। সে অরিককে কোনো রকম উপদেশ দিত না, সান্ত্বনা দেওয়ারও চেষ্টা করত না। শুধু নীরবে তার হাত ধরে বসে থাকত, তার সব কথা মন দিয়ে শুনত। মাঝে মাঝে তারা দুজনে মিলে মোহিনী দেবীর লেখা কবিতাগুলো পড়ত, মাধবের আঁকা ছবিগুলোর (যদি কোনোটা পাওয়া যায়) কল্পনা করত। এভাবেই তারা যেন সেই হতভাগ্য দুটি আত্মার সাথে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করত।
কয়েকদিন পর, অরিক একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। তার ভেতরের ঝড়টা হয়তো পুরোপুরি থামেনি, কিন্তু তার তীব্রতা কিছুটা কমেছিল। সে বুঝতে পারছিল, অতীতের এই কালো অধ্যায়কে অস্বীকার করে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাকে এই সত্যকে সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে হবে। এবং শুধু বেঁচে থাকাই নয়, এর একটা বিহিতও করতে হবে।
একদিন সন্ধ্যায়, তারা দুজনে গঙ্গার ঘাটে বসে ছিল। অস্তগামী সূর্যের লাল আভা নদীর জলে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। দূরে হাওড়া ব্রিজের আলো জ্বলে উঠেছে।
"আমরা এখন কী করব, নীরা?" অরিক শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল। "এই সত্যিটা কি আমরা সকলের সামনে তুলে ধরব? অলোকেশ চৌধুরীর আসল রূপটা কি আমরা প্রকাশ করব? মোহিনী দেবী আর মাধবের সুবিচারের জন্য কি আমরা লড়ব?" তার কণ্ঠে ছিল এক নতুন দৃঢ়তা।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, "এটা সম্পূর্ণ আপনার সিদ্ধান্ত, অরিকদা। আপনি যা চাইবেন, আমি আপনার পাশে থাকব। তবে আমার মনে হয়, সত্য প্রকাশ করা উচিত। মোহিনী দেবী আর মাধবের প্রতি যে অবিচার হয়েছে, তার প্রতিকার হওয়া দরকার। শুধু তাদের আত্মার শান্তির জন্য নয়, আপনার নিজের জন্যও এটা জরুরি। এই সত্যটা লুকিয়ে রাখলে আপনি কোনোদিন শান্তি পাবেন না। এই অপরাধবোধ আপনাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে।"
অরিক নীরার কথার গভীরতা উপলব্ধি করল। নীরা ঠিকই বলেছে। এই সত্যটা প্রকাশ না করলে সে সারাজীবন একটা অপরাধবোধে ভুগবে। তার পূর্বপুরুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাকেই করতে হবে। এটাই হয়তো তার নিয়তি।
তারা ঠিক করল, মোহিনী দেবীর চিঠিগুলো এবং অন্যান্য প্রমাণসহ একটা বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করে পুলিশের কাছে জমা দেবে। একইসাথে, নীরা তার পত্রিকায় এই বিষয়ে একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপবে। তারা জানত, কাজটা সহজ হবে না। এত পুরোনো একটা ঘটনা, যার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী আর বেঁচে নেই (হরিপদর কথা কেসটাকে খুব একটা শক্তিশালী করবে না), তার বিচার পাওয়া কঠিন। কিন্তু তারা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবে না।
কাজটা সত্যিই কঠিন ছিল। পুরোনো দিনের ঘটনা, সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব, আইনি জটিলতা – অনেক বাধা ছিল। অলোকেশ চৌধুরীর বংশধর হিসেবে অরিককেও অনেক অপ্রিয় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সমাজের একাংশ তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। কেউ কেউ বলতে লাগল, সে নিজের পরিবারের সম্মান নষ্ট করছে, পূর্বপুরুষের নামে কলঙ্ক লেপন করছে। কিন্তু অরিক জানত, সে যা করেছে, ঠিকই করেছে। সত্যের জন্য লড়াই করতে গিয়ে সে যদি কিছু হারায়, তাতে তার কোনো দুঃখ নেই।
নীরা সবসময় তার পাশে ছিল। তার ভালোবাসা, তার সমর্থন, তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি অরিককে সবরকম প্রতিকূলতার মোকাবিলা করার শক্তি জুগিয়েছিল। নীরা শুধু তার প্রেমিকা ছিল না, সে ছিল তার সহযোদ্ধা, তার বিবেক। এই কঠিন সময়ে, তাদের দুজনের সম্পর্ক আরও গভীর, আরও মজবুত হয়ে উঠল। তারা একে অপরের শক্তি হয়ে উঠেছিল। দুঃখ, যন্ত্রণা, আর্তি – সবকিছু তারা ভাগ করে নিত। অরিক বুঝতে পারছিল, নীরা শুধু তার প্রেমিকা নয়, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। নীরার ভালোবাসা তাকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছিল।
অবশেষে, তাদের প্রচেষ্টা আংশিকভাবে সফল হলো। পুলিশ নতুন করে তদন্ত শুরু করলেও, প্রমাণের অভাবে অলোকেশ চৌধুরীকে আইনত দোষী সাব্যস্ত করা গেল না। কিন্তু নীরার প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করল। অলোকেশ চৌধুরীর মুখোশ জনসমক্ষে খুলে গেল। ইতিহাস তাকে ক্ষমা করল না। সমাজের চোখে তিনি আর শ্রদ্ধেয় পূর্বপুরুষ রইলেন না, পরিণত হলেন এক ঘৃণ্য অপরাধীতে। শ্যামলগঞ্জের সেই পুরোনো জমিদার বাড়িটাকে ঘিরে যে রহস্যময়তা ছিল, তার অবসান ঘটল। মানুষ জানল সেই দিঘির জলের আসল রং, সেই মন্দিরের দেওয়ালে লেখা নামগুলোর পেছনের করুণ কাহিনী।
এই ঘটনার পর অরিকের জীবনে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এল। তার ভেতরের সেই "ডুবে যাওয়ার" অনুভূতিটা ধীরে ধীরে কেটে যেতে লাগল। সে যেন দীর্ঘদিনের একটা ভার থেকে মুক্তি পেল। তার মুখে আবার হাসি ফুটতে শুরু করল। সে অনুভব করল, সে তার পূর্বপুরুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পেরেছে, অন্তত কিছুটা হলেও। মোহিনী দেবী আর মাধবের অতৃপ্ত আত্মা হয়তো এবার শান্তি পাবে।
তবে, এই মুক্তি সহজ ছিল না। পারিবারিক সম্মানহানির জন্য তাদের পরিবারের কিছু দূর সম্পর্কের আত্মীয় অরিকের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। কিন্তু অরিক তাতে দমে গেল না। সে জানত, সে সত্যের পথ বেছে নিয়েছে।
নীরা সবসময় তার পাশে ছিল। তার ভালোবাসা, তার সমর্থন অরিককে সবরকম প্রতিকূলতার মোকাবিলা করার শক্তি জুগিয়েছিল। তাদের ভালোবাসা এই কঠিন পরীক্ষার আগুনে পুড়ে আরও খাঁটি হয়ে উঠেছিল।
একদিন সকালে, অরিক ঘুম থেকে উঠে দেখল, জানালার বাইরে নতুন ভোরের আলো। তার মনে হলো, তার জীবনের অন্তহীন রাত শেষ হয়েছে। এক নতুন ভোর তার জন্য অপেক্ষা করছে। এই ভোরে হয়তো অতীতের কিছু ছায়া লেগে থাকবে, কিছু যন্ত্রণা মিশে থাকবে। কিন্তু এই ভোরে ভালোবাসার আলোও থাকবে, যা তাকে পথ দেখাবে। এই আলো শুধু বাইরের নয়, তার ভেতরেরও। সে নিজেকে ক্ষমা করতে শিখেছে।
সে নীরার দিকে তাকাল। নীরা তখনো ঘুমাচ্ছে। তার মুখের ওপর ভোরের নরম আলো এসে পড়েছে। অরিক আলতো করে নীরার কপালে একটা চুমু খেল। তার মনে হলো, এই ভালোবাসাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এই ভালোবাসার জোরেই সে অতীতের সব কালিমা মুছে ফেলে এক নতুন জীবন শুরু করতে পারবে। তার মনে হলো, "কিছু সত্য চামড়ায় খোদাই হয়ে যায়... কিন্তু কিছু ভালোবাসা হৃদয়ে খোদাই হয়ে যায়, যা কোনোদিন মোছা যায় না।" এই উপলব্ধিটাই তার জীবনের নতুন মন্ত্র হয়ে উঠল।
এপিলোগ: জীবনের খাতায় নতুন অধ্যায়
কয়েক বছর কেটে গেছে। অরিক আর নীরা এখন বিবাহিত। তাদের ছোট্ট একটা সংসার। কলকাতার কোলাহল থেকে দূরে, গঙ্গার ধারে একটা পুরোনো দিনের বাড়ি ভাড়া নিয়েছে তারা। বাড়িটার একটা ছোট্ট বাগান আছে, যেখানে নীরা নিজের হাতে ফুলগাছ লাগিয়েছে। অরিক মহাফেজখানার চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এখন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছে। সে তরুণ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে শুধু শুকনো তথ্যের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং জীবনবোধের উৎস হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তার ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় উপচে পড়ে। নীরাও তার সাংবাদিকতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সাহসিকতার সাথে। সে এখন মূলত সামাজিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লেখে। তার কলম অনেক নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।
অলোকেশ চৌধুরীর ঘটনাটা তাদের জীবনে একটা গভীর ছাপ রেখে গেছে। সেই ভয়ঙ্কর সত্যের স্মৃতি তারা কোনোদিন ভুলতে পারবে না। কিন্তু তারা সেই স্মৃতিকে তাদের বর্তমানকে বিষাক্ত করতে দেয়নি। তারা শিখেছে, অতীতকে স্বীকার করে, তার থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। তারা শ্যামলগঞ্জে একটা ছোট লাইব্রেরি আর দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরি করেছে মোহিনী দেবী আর মাধবের নামে। গ্রামের মানুষ এখন তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। সেই অভিশপ্ত দিঘিটার সংস্কার করা হয়েছে, তার জল এখন গ্রামের চাষবাসের কাজে লাগে। পুরোনো মন্দিরটাও মেরামত করা হয়েছে।
অরিকের মুখে এখন আর সেই পুরোনো বিষণ্ণতার ছায়া দেখা যায় না। তার চোখে এখন আত্মবিশ্বাসের আলো, আর এক ধরণের প্রশান্তি। সে জানে, তার পূর্বপুরুষের অপরাধ তার পরিচয় নয়। তার পরিচয় তার সততা, তার জ্ঞান, আর তার ভালোবাসা। সে তার ছাত্রদের প্রায়ই বলে, "ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা নয়, ইতিহাস আমাদের শেখায় কীভাবে মানুষ হিসেবে আরও ভালো হওয়া যায়, কীভাবে অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া যায়।"
নীল ডায়েরিটা অরিক এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছে। ওটা এখন আর শুধু একটা অভিশপ্ত অতীতের দলিল নয়, ওটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নথি, যা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে পারবে। অরিক মাঝে মাঝে ডায়েরিটা খোলে, অলোকেশের কালির অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে আর কোনো ঘৃণা বা ক্ষোভ জন্মায় না। বরং একটা অদ্ভুত করুণা হয় সেই মানুষটার জন্য, যে হিংসা আর সন্দেহের বশবর্তী হয়ে নিজের জীবনটাকেই নষ্ট করে ফেলেছিল, আর দুটো নিষ্পাপ জীবন কেড়ে নিয়েছিল। সে ভাবে, অলোকেশও হয়তো পরিস্থিতির শিকার ছিলেন, তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতা আর পুরুষতান্ত্রিকতার শিকার।
তাদের বসার ঘরের দেওয়ালে এখনো অলোকেশ আর মোহিনীর সেই পুরোনো ফটোগ্রাফটা টাঙানো আছে। তবে তার পাশে এখন অরিক আর নীরার হাসিমুখের একটা নতুন ছবিও জায়গা করে নিয়েছে। দুটো ছবি যেন দুটো ভিন্ন সময়ের, দুটো ভিন্ন পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি। একটাতে আছে অন্ধকার, রহস্য আর যন্ত্রণা। অন্যটাতে আছে আলো, ভালোবাসা আর আশা। মাঝে মাঝে অরিক ছবি দুটোর দিকে তাকিয়ে ভাবে, কত সহজে অন্ধকার আলোকে গ্রাস করতে পারে, আবার কত সহজে ভালোবাসা সেই অন্ধকার দূর করে দিতে পারে।
একদিন সন্ধ্যায়, অরিক আর নীরা তাদের ছোট্ট বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছিল আর গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ছিল। আকাশজুড়ে তখন আবিরের রঙ। নদীর জল শান্ত, মৃদু বাতাসে তাদের চুল উড়ছে।
"তোমার কি কখনো মনে হয়, আমরা যদি সেই রহস্যের সন্ধান না করতাম, তাহলে জীবনটা অন্যরকম হতো?" অরিক নীরাকে জিজ্ঞাসা করল, তার হাতে আলতো চাপ দিয়ে।
নীরা হাসল। তার হাসিতে ছিল তৃপ্তি আর ভালোবাসা। "হয়তো হতো। হয়তো অনেক সহজ হতো। কিন্তু আমি এই জীবনটা নিয়েই খুশি। কারণ এই জীবনে তুমি আছো, আমাদের ভালোবাসা আছে। আর আছে কিছু কঠিন সত্য, যা আমাদের আরও শক্তিশালী করেছে, আরও মানবিক করেছে। আমরা শুধু নিজেদের জন্য বাঁচিনি, অরিকদা। আমরা মোহিনী দেবী আর মাধবের জন্যও বেঁচেছি।"
অরিক নীরার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিল। "কিছু সত্য চামড়ায় খোদাই হয়ে যায়... কিন্তু কিছু ভালোবাসা হৃদয়ে খোদাই হয়ে যায়, যা কোনোদিন মোছা যায় না। তুমি আমার সেই না-মোছা ভালোবাসা, নীরা।"
নীরা অরিকের কাঁধে মাথা রাখল। জীবনের খাতায় তাদের গল্পটা হয়তো অনেক জটিল অক্ষরে লেখা হয়েছে, অনেক রক্তের দাগ লেগে আছে। কিন্তু সেই জটিল অক্ষরের ফাঁকে ফাঁকেই ফুটে উঠেছে ভালোবাসার সহজ, সরল সুর, যা তাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছে। অতল জলের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া সেই রহস্যের ভার হয়তো পুরোপুরি লাঘব হয়নি, সেই "জীবন্ত কালি" হয়তো এখনো তাদের অস্তিত্বে মিশে আছে। কিন্তু ভালোবাসার শক্ত ভেলায় চেপে তারা এখন অনায়াসে সেই জলপথ পাড়ি দিতে পারে। কারণ তারা জানে, জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের সমাধান লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার মধ্যেই। আর সেই ভালোবাসা দিয়েই তারা তাদের জীবনের প্রতিটি নতুন অধ্যায় লিখে চলেছে, নির্ভয়ে, তাদের সামনে এখন আর অন্তহীন রাত নয়, এক অনন্ত ভোর, যেখানে প্রেমই একমাত্র ধ্রুবতারা।