সে রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। শুধু একটা মোমবাতি ছিল আমার কাছে। আর সেই অন্ধকার ঘরে আমি জানতাম না যে আমি একা নই।
আমার নাম সাগর। বয়স তখন বাইশ। পুরান ঢাকার একটা গলির ভেতরে পুরনো বাড়িতে একা থাকতাম। বাড়িওয়ালা বলেছিল বাড়িটা পুরনো, তবে ভালো। কিন্তু সে যা বলেনি — সেটাই সেই রাতে আমি জানলাম।
রাত বারোটা পার হয়ে গিয়েছিল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। ভারী, একটানা বৃষ্টি। বিদ্যুৎ গেছে ঘণ্টাখানেক আগে। মোমবাতির আলোয় বই পড়ছিলাম। হঠাৎ পিছনে একটা শব্দ হল।
মেঝেতে কিছু একটা সরল। আমি ঘুরে তাকালাম।
কিছু নেই।
শুধু মোমবাতির আলো কাঁপছে। আর সেই কাঁপা আলোয় দেওয়ালের ছায়া যেন একটু বেশি গাঢ় লাগছিল।
মনকে বললাম — ভয় পাচ্ছি, তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু মন মানল না। কারণ মোমবাতির আলো সত্যিই কাঁপছিল। আর ঘরে কোনো জানালা খোলা ছিল না।
তাহলে বাতাস কোথা থেকে এলো?
আমি উঠে দাঁড়ালাম। মোমবাতি হাতে নিলাম। ঘরের চারপাশটা একবার দেখলাম। চেয়ার, টেবিল, আলমারি — সব জায়গায় চোখ বোলালাম। কিছু নেই। একদম কিছু নেই।
কিন্তু তখনই আমি বুঝলাম — আলমারির দরজাটা অর্ধেক খোলা।
আমি নিজে সেটা বন্ধ করে রেখেছিলাম। সকালে। আমি মনে করতে পারি।
বুকটা ধুকধুক করতে লাগল। হাত একটু কাঁপছে। কিন্তু সাহস করে এগিয়ে গেলাম। আলমারির কাছে গেলাম। মোমবাতির আলো তুলে ধরলাম।
ভেতরে কেউ নেই। শুধু কাপড় আর বই।
শ্বাস ছাড়লাম। নিজেকে বললাম — বোকামি করছি।
তখনই পেছন থেকে কেউ আমার কাঁধে হাত রাখল।
আমি চিৎকার দিতে পারলাম না। গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। মোমবাতিটা মেঝেতে পড়ে নিভে গেল। সবকিছু অন্ধকার।
সেই অন্ধকারে একটা ফিসফিসানি শুনলাম।
শুধু দুটো শব্দ।
"বাড়ি ফেরো।"
তারপর কিছু মনে নেই।
সকালে পড়শি মহিলা আমাকে জানালা দিয়ে দেখতে পেয়ে দরজা ভেঙে ঢুকেছিল। আমি মেঝেতে পড়ে ছিলাম। অজ্ঞান। মোমবাতি নিভে গেছে। কিন্তু ঘরের মাঝখানে একটা ছোট্ট কাগজের টুকরো।
তাতে আমার মায়ের হাতের লেখায় লেখা — "মা মারা গেছেন। বাড়ি ফেরো।"
আমার মা সেই রাতে মারা গিয়েছিলেন। ঠিক রাত বারোটার পরে।
কিন্তু সে খবর সকালের আগে কেউ আমাকে জানায়নি।
তাহলে সেই হাতটা কার ছিল?
Compete in the next Golper Lorai writing competition and get your story read by thousands.